সুইচ ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

আপনি লাইটের সুইচের কাছে গেলেন, বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে সুইচটা টিপলেন, কিন্তু... কিছুই হলো না। ঘরটি অন্ধকারই রয়ে গেল। ঘটনাটি কি পরিচিত মনে হচ্ছে? ইলেকট্রিশিয়ানকে ডাকার জন্য ফোন হাতে নেওয়ার আগে, একটু দম নিন। লাইটের সুইচ বদলানো ঘরের এমন একটি মেরামতের কাজ, যা বাইরে থেকে কঠিন মনে হলেও, নিয়ম জানা থাকলে আসলে খুবই সহজ।
এই গাইডটি সাধারণ মানুষের জন্য লেখা হয়েছে, পেশাদার ইলেকট্রিশিয়ানদের জন্য নয়। এর জন্য আপনার বছরের পর বছরের অভিজ্ঞতা বা বিশাল সরঞ্জামের ভাণ্ডারের প্রয়োজন নেই। আপনার শুধু দরকার সামান্য ধৈর্য, সঠিক যন্ত্রপাতি এবং ধাপে ধাপে পুরো প্রক্রিয়া দেখানো এই গাইডটি। কাজ শেষে আপনি পাবেন একটি সচল সুইচ এবং নিজের হাতে কিছু মেরামত করার আত্মতৃপ্তি।
সব লাইটের সুইচ কিন্তু এক রকম হয় না। তাই বদলানোর জন্য নতুন সুইচ কেনার আগে আপনি আসলে কোন ধরনের সুইচ নিয়ে কাজ করছেন, তা জেনে রাখাটা বুদ্ধিমানের কাজ।
সিঙ্গেল-পোল (Single-pole) সুইচ: বাসাবাড়িতে এটিই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে একটি লাইট নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আমাদের এই গাইডে আমরা মূলত এই সুইচটি নিয়েই আলোচনা করব।
৩-ওয়ে (3-way) সুইচ: এই সুইচটি দিয়ে দুটি ভিন্ন জায়গা থেকে একটি লাইট নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যেমন—সিঁড়ির উপর এবং নিচ থেকে।
ডিমার (Dimmer) সুইচ: এর সাহায্যে আপনি আলোর উজ্জ্বলতা বা তীব্রতা কম-বেশি করতে পারেন। ঘরের পরিবেশে একটু ভিন্নতা বা আমেজ আনতে চাইলে এটি একটি চমৎকার অপশন।
আপনি যদি এই কাজে নতুন হয়ে থাকেন, তবে সিঙ্গেল-পোল সুইচ দিয়েই শুরু করুন। এটি সবচেয়ে সাধারণ এবং এতে কাজ করা অনেক সহজ। একবার এটি ঠিকমতো আয়ত্ত করতে পারলে, অন্যগুলো আর আপনার কাছে তেমন কঠিন মনে হবে না।
নোটঃ বাজারে এখন স্মার্ট সুইচও পাওয়া যায়। সেগুলো পরিবর্তনের পদ্ধতিও ঠিক আমরা যে পদ্ধতি বর্ণনা করতে যাচ্ছি তার মতোই।
সুসংবাদ হলো: এর বেশিরভাগ জিনিসই সম্ভবত আপনার ঘরের কোনো ড্রয়ারে বা ছোট টুলবক্সে আগে থেকেই আছে। কাজ শুরু করার আগে নিচের জিনিসগুলো গুছিয়ে নিন:
ফ্ল্যাটহেড এবং ফিলিপস স্ক্রু ড্রাইভার (Flathead and Phillips screwdrivers)
নন-কন্টাক্ট ভোল্টেজ টেস্টার (এটি সস্তা কিন্তু খুবই কাজের)
নতুন লাইট সুইচ এবং মানানসই ওয়াল প্লেট
ইলেকট্রিক্যাল টেপ
নিডল-নোজ প্লায়ার্স (থাকলে ভাল, তবে এটা তার বাঁকানোর জন্য বেশ সুবিধাজনক)
ভোল্টেজ টেস্টারটির কথা আমরা বিশেষভাবে বলতে চাই। এটি ছোট এবং সাশ্রয়ী, যা আপনাকে জানিয়ে দেবে তারের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হচ্ছে কি না। পুরো প্রজেক্টে এটিকে আপনার নিরাপত্তার কবচ হিসেবে ধরে নিতে পারেন।
পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বাকি সব কিছু এই একটি ধাপের ওপর নির্ভর করছে। আপনার ঘরের মেইন ব্রেকার বক্স বা ডিস্ট্রিবিউশন বোর্ডে যান, যে সার্কিটটি ওই ঘরের সুইচ নিয়ন্ত্রণ করে সেটি খুঁজে বের করুন এবং তা 'Off' করে দিন।
যদি আপনার ব্রেকারগুলোতে কোনো লেবেল বা নাম লেখা না থাকে (যা অনেক সময় থাকে না), তবে একজনকে ওই ঘরের লাইটের দিকে তাকিয়ে থাকতে বলুন এবং আপনি একে একে ব্রেকারগুলো বন্ধ করে পরীক্ষা করুন। লাইটটি নিভে গেলেই বুঝবেন আপনি সঠিক ব্রেকারটি খুঁজে পেয়েছেন। এই সুযোগে ব্রেকারটিতে একটি লেবেল লাগিয়ে দিন; ভবিষ্যতে আপনারই সুবিধা হবে।
ব্রেকার বন্ধ করার পর সুইচের কাছে ফিরে আসুন এবং ভোল্টেজ টেস্টারটি সুইচের কাছে ধরুন। বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে থাকলে টেস্টারটি বিপ শব্দ করবে বা জ্বলে উঠবে। যদি কোনো শব্দ না হয়, তবে আপনি কাজ শুরু করার জন্য প্রস্তুত। নিরাপত্তার খাতিরে দয়া করে এই ধাপটি এড়িয়ে যাবেন না।
শুরুতেই ওয়াল প্লেটের স্ক্রুগুলো খুলে নিন। সাধারণত এটি একটি বা দুটি স্ক্রু দিয়ে আটকানো থাকে। প্লেট এবং স্ক্রুগুলো নিরাপদ কোনো জায়গায় রাখুন, কারণ নতুন প্লেটের সাথে যদি স্ক্রু না থাকে তবে এগুলো আপনার কাজে লাগতে পারে।
এরপর ইলেকট্রিক্যাল বক্স থেকে মূল সুইচটি স্ক্রু খুলে আলাদা করুন। সুইচের উপরে একটি এবং নিচে একটি—মোট দুটি স্ক্রু পাবেন। স্ক্রুগুলো খুলে ফেলার পর সাবধানে সুইচটি সামনের দিকে টেনে বের করে আনুন। এখন আপনি সুইচের পেছনের দিকে তারগুলো সংযুক্ত অবস্থায় দেখতে পাবেন।
এখানে একটি টিপস দিচ্ছি যা আপনার দুশ্চিন্তা অনেক কমিয়ে দেবে: তারের সংযোগ খোলার আগে একটি ছবি তুলে রাখুন। গুরুত্ব সহকারে বলছি, আপনার ফোন বের করে একটি স্পষ্ট ছবি তুলে নিন। যদি পরবর্তীতে সংযোগ দেওয়ার সময় কোনো দ্বিধায় পড়েন, তবে এই ছবিটিই আপনার রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে।
ছবি তোলা হয়ে গেলে, পুরনো সুইচের টার্মিনাল থেকে তারগুলো খুলে ফেলুন এবং পুরনো সুইচটি সরিয়ে রাখুন।
আরও পড়ুনঃ স্মার্ট সুইচের ১০টি লাভজনক সুবিধা
তারগুলোর দিকে তাকালে শুরুতে একটু খটকা লাগতে পারে, কিন্তু এটি আসলে যতটা ভাবছেন তার চেয়েও সহজ। কোন রঙের তারের কাজ কী, তার একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা নিচে দেওয়া হলো:
লাল তার (Red wire): এটি হলো 'হট' (Hot) বা ফেইজ তার। এটি সরাসরি বিদ্যুৎ বহন করে।
কালো তার (Black wire): এটি সাধারণত 'নিউট্রাল' (Neutral) তার। তবে সুইচের ওয়্যারিং-এর ক্ষেত্রে এটি অনেক সময় দ্বিতীয় 'হট' তার হিসেবেও কাজ করে, যার কারণে অনেক সময় এতে কালো রঙের কস্টেপ পেঁচানো থাকতে পারে।
সাদা বা খোলা তামার তার (White or bare copper wire): এটি হলো 'গ্রাউন্ড' (Ground) তার। এটি একটি নিরাপত্তামূলক তার যা কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির সময় আপনাকে দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করে।
আপনার তোলা সেই ছবিটির কথা মনে আছে তো? এখন সেটি কাজে লাগানোর সময়। নতুন সুইচের সাথে সংযোগ শুরু করার আগে আপনার সামনে থাকা তারগুলোর সাথে তোলা ছবিটির মিলিয়ে দেখে নিন যে সবকিছু ঠিক আছে কি না।
এখন সেই কাজটির সময় যা আপনার কাছে সত্যিকারের ইলেকট্রিক্যাল কাজের মতো মনে হবে। আপনার নতুন সুইচটি হাতে নিন এবং ভালো করে দেখুন। আপনি পাশে ছোট ছোট স্ক্রু টার্মিনাল এবং সম্ভবত পেছনের দিকে 'পুশ-ইন' (push-in) কানেক্টর হোল দেখতে পাবেন।
আমরা 'পুশ-ইন' কানেক্টরের চেয়ে স্ক্রু টার্মিনাল ব্যবহার করার পরামর্শ দিই। স্ক্রু দিয়ে লাগানো সংযোগগুলো অনেক বেশি মজবুত হয় এবং সময়ের সাথে ঢিলে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। সংযোগ দেওয়ার নিয়মটি নিচে দেওয়া হলো:
লাল তারটি সুইচের পাশের পিতল রঙের (brass-colored) যেকোনো একটি স্ক্রুর সাথে যুক্ত করুন।
কালো তারটি (বা দ্বিতীয় হট তার) অন্য পিতল রঙের স্ক্রুটির সাথে যুক্ত করুন।
খোলা তামা বা সাদা তারটি সুইচের সবুজ স্ক্রুর সাথে যুক্ত করুন। এটি হলো গ্রাউন্ড সংযোগ।
নিশ্চিত করুন যে প্রতিটি তার স্ক্রুর সাথে শক্তভাবে লেগে আছে এবং কোনো আলগা তামার অংশ যেন অদ্ভুতভাবে বেরিয়ে না থাকে। যদি কোনো খোলা তার অন্য তারকে স্পর্শ করার সম্ভাবনা থাকে, তবে সেখানে সামান্য ইলেকট্রিক্যাল টেপ পেঁচিয়ে দিন। এটি একটি সাধারণ সতর্কতা যা বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
আপনি প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছেন। খুব সাবধানে তারগুলোকে ইলেকট্রিক্যাল বক্সের ভেতর ভাঁজ করে ঢুকিয়ে দিন, কোনো জোর করবেন না। এরপর একই ওপরের এবং নিচের স্ক্রু ব্যবহার করে নতুন সুইচটি বক্সের সাথে আটকে দিন। স্ক্রুগুলো খুব বেশি টাইট করবেন না, শুধু ঠিকমতো আটকে থাকলেই হবে। অতিরিক্ত টাইট করলে সুইচের প্লাস্টিক ফেটে যেতে পারে, আর তখন আপনাকে আবার শুরু থেকে কাজ শুরু করতে হবে।
সুইচটি ঠিকমতো লাগানো হয়ে গেলে ওয়াল প্লেটটি বসান এবং স্ক্রু দিয়ে আটকে দিন। এবার মেইন ব্রেকার বক্সের কাছে যান এবং সার্কিটটি পুনরায় চালু (On) করে দিন। এখন সুইচের কাছে ফিরে এসে সেটি টিপুন।
লাইটটি কি জ্বলে উঠেছে? অভিনন্দন! আপনি সফলভাবে একটি লাইট সুইচ বদলে ফেলেছেন। নিজের এই সাফল্যে গর্ববোধ করতেই পারেন।
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশের সেরা ১২টি সুইচ সকেট ব্র্যান্ড
প্রথমবার নিজে নিজে কোনো কিছু মেরামত করতে গেলে যে কেউ ভুল করতে পারে। এখানে সাধারণ কিছু ভুলের কথা তুলে ধরা হলো যাতে আপনি সেগুলো পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে পারেন:
ভোল্টেজ টেস্টার ব্যবহার না করা: ব্রেকার বন্ধ করেছেন বলেই বিদ্যুৎ নেই—এমনটা ধরে নেবেন না। সবসময় টেস্টার দিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিন।
আসল ওয়্যারিং-এর ছবি না তোলা: এই ছোট অভ্যাসটি পরে আপনাকে অনেক বড় বিভ্রান্তি থেকে বাঁচাবে।
স্ক্রু অতিরিক্ত টাইট দেওয়া: শক্ত করে আটকানো ভালো, কিন্তু প্লাস্টিক ফেটে যাওয়া মোটেও ভালো নয়। দৃঢ়ভাবে আটকান, তবে অতিরিক্ত জোর করবেন না।
তারের সংযোগ ঢিলে রাখা: তারের সংযোগ ঠিকমতো না হলে লাইট দপদপ (flickering) করতে পারে, কাজ না করতে পারে, এমনকি বড় কোনো দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। নিশ্চিত করুন প্রতিটি সংযোগ মজবুত আছে।
ভুল সুইচ কেনা: আপনি যে সুইচটি পাল্টাচ্ছেন সেটি যদি 'সিঙ্গেল-পোল' হয়, তবে কেনার সময় পুনরায় যাচাই করে নিন যে আপনি সঠিক সুইচটিই কিনছেন কি না।
আমরা সবাই কোনো না কোনো কাজে তাড়াহুড়ো করে পরে তার মাসুল গুনেছি। এই কাজে হাতে সময় নিয়ে এগোবেন। পুরো কাজটি করতে মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিট সময় লাগার কথা, তাই তাড়াহুড়ো করার কোনো প্রয়োজন নেই।
নিজে নিজে মেরামত করা ভালো, কিন্তু কখন থেমে যেতে হবে সেটা জানাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিচের পরিস্থিতিগুলোতে স্ক্রু ড্রাইভার রেখে দিয়ে একজন লাইসেন্সধারী ইলেকট্রিশিয়ানকে কল করা উচিত:
বক্সের ভেতরের তারগুলো পোড়া, ছেঁড়া বা তারের ওপরের প্লাস্টিক আবরণ (insulation) গলে গেছে।
আপনার ধারণার চেয়েও অনেক বেশি তার সেখানে রয়েছে এবং আপনি বুঝতে পারছেন না কোনটি কিসের তার।
নতুন সুইচ লাগানোর পর বারবার ব্রেকার ট্রিপ করছে (অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে)।
ব্রেকার বন্ধ করার পরেও ভোল্টেজ টেস্টারে বিদ্যুৎ দেখাচ্ছে।
এসব লক্ষণের যেকোনো একটি থাকা মানে সেখানে গভীর কোনো বৈদ্যুতিক সমস্যা আছে যা শুধু সুইচ বদলে ঠিক হবে না। বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে কোনো লজ্জা নেই। নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকাটা ব্যর্থতা নয়, বরং বিচক্ষণতার পরিচয়।
লাইটের সুইচ বদলানো এমন একটি কাজ যা প্রথমবার ভয়ংকর মনে হলেও দ্বিতীয়বার থেকে একদম স্বাভাবিক মনে হয়। আপনি বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করেছেন, পুরনো সুইচ খুলেছেন, নতুনটি লাগিয়েছেন এবং সবকিছু নিরাপদে পুনরায় চালু করেছেন। এটি একটি বাস্তব এবং কার্যকর দক্ষতা যা আপনার সারাজীবন প্রতিটি ঘরের জন্য কাজে লাগবে।
ট্যাগ: